২২ বছর পর ভোটে হারলেন ‘ভিনদেশি’ মুক্তিযোদ্ধা নানকা

129158.jpeg

প্রথমবারের মতো পরাজিত হতে হলো জেমস লিও ফারগুসন নানকাকে। মাঝে একটা বিরতি দিয়ে ২২ বছর ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তবে এইবার হেরে যেতে হলো ‘সাহেব’ থেকে ‘চেয়ারম্যান সাহেব’ হয়ে ওঠা এই স্কটিশ বংশদ্ভূতকে।

পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনে বুধবার সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নে ভোটে হেরে যান চারবারের চেয়ারম্যান নানকা। এই ইউনিয়নের নতুন চেয়ারম্যান হন জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের জামাল উদ্দিন।

‘ভিনদেশি’ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় নিজ এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন নানকা। সেই জনপ্রিয়তার সুবাদে যুদ্ধের পর ১৯৭৬ সালে তরুণ বয়সে লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৯৩ সাল পর্যন্ত টানা ১৭ বছর এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালে পরিবারের কাছে চলে যান ইংল্যান্ডে। প্রায় ১৮ বছর পর ২০১৪ সালে আবার দেশে ফেরেন তিনি।

এর দুবছর পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আবার প্রার্থী হন নানাকা। আগের সবগুলো নির্বাচনে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সেবার নৌকা দেয়া হয় তাকে। বিজয়ীও হন তিনি।

তবে পা পিছলে যায় এবার। বড় ব্যবধানেই হেরেছেন তিনি। হয়েছেন তৃতীয়। এই পরাজয়ের পেছনে দলীয় কোন্দল আর কিছু নেতার অসহযোগিতাকে দায়ী করেছেন নানকা।

তবে তার পরাজয়ের পেছনে কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়া ও এলাকার মানুষের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হওয়াকেও সামনে এনেছেন স্থানীয়রা। তবে কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।

শুরুতেই স্থানীয়দের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যে উন্নয়ন কাজ করেছি তা তো এখনও দৃশ্যমান। তবে করোনার কারণে গত দুই বছর উন্নয়নমূলক কাজে স্থবিরতা ছিল। এটা তো শুধু এই এলাকায় না সারা দেশেই ছিল।’

ভোটে পরাজয় প্রসঙ্গে নানকা বলেন, ‘দলের লোকজন অসহযোগিতা করেছেন। তারা আমারে দেখতে পারেন না। অন্যদিকে বিজয়ী প্রার্থীর লোকজন আটঘাট বেঁধে কাজ করেছে।’

নিজে এইবার প্রার্থী হতে চাননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে অনুরোধ করে প্রার্থী করা হলো। তৃণমূল থেকে আমার, রিংকু চক্রবর্তী ও তোতা মিয়া নাম কেন্দ্রে পাঠানো হলো। কেন্দ্রীয় নেতারা আমাকে মনোনয়ন দিলেন। এটা সহ্য করতে পারেননি অন্য দুই মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারা প্রকাশ্যে আমার পক্ষে থাকলেও আড়ালে বিরোধিতা করেন।’

দলের এই অসহযোগিতা জেলা ও উপজেলার নেতাদের জানিয়েছিলেন দাবি করে নানকা বলেন, ‘তারা শক্ত কোনো ব্যবস্থা নেননি। তাদের মধ্যে ঢিলেমি ছিল। এ কারণে আজ নৌকাকে হারতে হলো।’

একই ধরনের অভিযোগ করে নানকার ভাগনে ইয়ামিন ওসমান বলেন, ‘তার বয়স হচ্ছে। অসুস্থও। তাই এবার নির্বাচন করতে তাকে আমরা নিষেধ করেছিলাম। তবু মানুষের অনুরোধে প্রার্থী হন। কিন্তু দলের কিছু নেতাদের অসহযোগিতার কারণে হারতে হলো।’

নানকার অভিযোগ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক ছাড়াও বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ কাজ করে। দলের মধ্যেও কিছু সমস্যা আছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকায় অনেক নেতাই এখন প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। তবে যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

নানকার পরাজয়ে ব্যথিত তার সহযোদ্ধারা। সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল বলেন, ‘উনি নিভৃতচারী বীর মুক্তিযোদ্ধা। একেবারে প্রচার চান না। আমরা একবার বিজয় দিবসে তাকে সংবর্ধনা দিতে চেয়েছিলাম। তিনি রাজি হননি।’

কথা প্রসঙ্গে ফারগুসনের পরিবারের বরাতে তিনি জানান, একাত্তরে দেশের যখন যুদ্ধদিন জেমস লিও ফারগুসন তখন সবে কৈশোর পেরিয়েছেন। পড়েন ক্যাডেট কলেজে। চা বাগান ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিল তার পরিবার। সেই সূত্রে সিলেটেই থাকতেন।
২২ বছর পর ভোটে হারলেন ‘ভিনদেশি’ মুক্তিযোদ্ধা

ফারগুসনের মা জুন ফারগুসন লোভাছড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক ছিলেন। তৎকালীন সময়ে এই উপমহাদেশে তিনিই ছিলেন চা-বাগানের প্রথম নারী ব্যবস্থাপক।

এরআগে তার নানাও এই বাগানের ব্যবস্থাপক ছিলেন। আর বাবা জে ফারগুসন ছিলেন ব্যবসায়ী। তিনি মাঝেমধ্যেই এখানে আসতেন। পরে তারা লোভাছড়া চা-বাগান কিনে নেন। পঞ্চাশের দশকে লিও ফারগুনসনের জন্ম হয় এখানেই।

এই জন্মঋণ ‘শোধ’ করতেই হয়তো একাত্তরে বাঙালির সঙ্গে অস্ত্রহাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। ৫ নম্বর সাবসেক্টরের হয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।

স্কটিশ স্ত্রী কুইনলা দুই সন্তানসহ ইংল্যান্ডে থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া চা বাগানেই থাকেন নানকা।

চা বাগান ব্যবস্থাপনা আর জনপ্রিতিনিধির দায়িত্ব নিয়েই এতদিন ব্যস্ত ছিলেন। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব থেকে ‘আপাত’ বিশ্রাম পেলেন তিনি।

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সিলেটের অনেক ইউনিয়নেই নৌকা ডুবছে। দলের কোন্দেলের সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা। তবে অন্য সবার চাইতে নানকার পরাজয় আলাদাভাবে আলোচিত হচ্ছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com