সিলেটে প্রতারক আমিনুরের সঙ্গে কারা জড়িত?

am.jpg

রোমানিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে সিলেটে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া প্রতারক আমিনুর রহমানের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য।

এছাড়াও রিমান্ড শেষে সোমবার (৭ মার্চ) তাকে আদালতে হাজির করা হলে সেখানে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, আমিনুরের সঙ্গে সিলেটের আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ তাদের ঘিরে জাল গুটিয়ে আনছে। শীঘ্রই তাদের গ্রেফতারের আশা প্রকাশ করেছে পুলিশ।

সিলেটে গত কয়েকদিন ‘টক অব দ্যা টাউন’ ছিলো প্রতারক আমিনুর রহমান। গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে তার সম্পর্কে নানা অজানা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিনি নিজেকে স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের উপদেষ্টা ও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বেড়াতেন। প্রতারণার দায়ে আগেও একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। তারপরও থেমে থাকেনি তার প্রতারণা।

সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে সিলেটের প্রায় ৩ শ মানুষের কাছ থেকে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দিয়েছিলেন আমিনুর। এমনকি পালিয়েও যেতে চেয়েছিলেন বিদেশে। কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় তার সে অপতৎপরতা সফল হয়নি। গত ১ মার্চ তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছে পুলিশের হাতে। পরদিন (২ মার্চ) তাকে আদালতে প্রেরণ করে রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আদালত এসময় আমিনুরকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আমিনুর রহমান সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নিজগাওয়ের তোফাজ্জল আলীর ছেলে। সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার এলাকার হক সুপার মার্কেটে আমিন রহমান ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলেন। নামসর্বস্ব সেই প্রতিষ্ঠান খুলে সিলেটের প্রায় ৩ শ তরুণের কাছ থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন আমিনুর রহমান।

সম্প্রতি তরুণদের কয়েকজনের রোমানিয়ায় ফ্লাইট দেয়ার কথা ছিল। তারা আমিনুর রহমানের দেয়া কথামতো রোমানিয়া যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টেও চলে গিয়েছিলেন। এয়ারপোর্টে গিয়ে আমিনুর রহমানকে ফোন দিলে সে ফোন ধরেনি। বিদেশ যেতে না পেরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তরুণরা সিলেটের জিন্দাবাজারের আমিন রহমান ট্রাভেলসে এসে জানতে চাইলে প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে।

এর দুই দিন আগ থেকে আত্মগোপনে চলে যান আমিনুর রহমান। এরপর ভুক্তভোগীরা এসে ভিড় জমান ট্রাভেলসে। ১ মার্চ দক্ষিণ সুরমার বানেশ্বরপুরের বাসিন্দা ভুক্তভোগী ফখরুল ইসলাম বাদি হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যাতে ১৮ জন ভুক্তভোগী তাদের নগদ ১ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। সর্বমোট ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয় এজাহারে। মামলায় আমিনুর রহমান ছাড়াও তার আরো দুই ভাই সিদ্দিকুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে সিদ্দিকুর রহমান একজন পুলিশ সদস্য।

জানা যায়, আমিনুর রহমান এই প্রথম গ্রেফতার হননি। ২০১৫ সালে দেশব্যাপী আলোচিত একটি প্রতারণা মামলায় সহযোগীসহ গ্রেফতার হয়েছিলো সে। অতিদরিদ্র পরিবারের বেড়ে ওঠা আমিনুর রহমান প্রথমে একটি ট্রাভেলসে সহকারীর কাজ করতো। একটা সময় নিজ এলাকায় ‘এডভান্স’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেন। যেখান থেকে পাসপোর্ট নবায়নসহ নানা কাজ সিলেট শহরের বিভিন্ন ট্রাভেলস থেকে করিয়ে নিতেন। যে কারণে তিনি এলাকায় অনেকটা ‘এডভান্স আমিন’ নামে পরিচিত। এরপর আর বসে থাকেননি। নিজেই নগরীর রংমহল টাওয়ারের একটি অফিস খুলেন।

সেখানে বসে সিলেটের স্থানীয় একটি পত্রিকার উপদেষ্টা হিসেবে সংবর্ধিত হয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে থাকেন। এরপর আর অপেক্ষা সয়নি। নিজে সিলেটের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে অফিস খুলেন আমিনুর রহমান। নিজের নামে খুলেন আমিন রহমান ট্রাভেলস। রোমানিয়ার মানুষ পাঠানোর কথা বলে গণমাধ্যমে দেন বিজ্ঞাপন। বাসা ভাড়া নেন নগরীর উপশহরে। বাড়তে থাকে প্রতারণার জাল। এরপর সিলেটের দুই শতাধিক তরুণকে রোমানিয়া পাঠানোর কথা বলে ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন আমিনুর।

দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাইছিলেন কোটি কোটি টাকা আত্মসাতকারী সেই আমিনুর রহমান। তবে দ্রুত পদক্ষেপে সে আটকা পড়ে পুলিশের জালে। ঢাকা থেকে বিদেশে যেতে ব্যর্থ হয়ে সিলেটে ফেরার পথে ১ মার্চ বেলা ২টায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেতলী এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

পরদিন তাকে আদালতে প্রেরণ করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ৭ মার্চ তাকে আদালতে প্রেরণ করলে আদালত আমিনুরকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)বলেন, রিমান্ড শেষে গতকাল (৭ মার্চ) আমিনুরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এছাড়াও রিমান্ডের সময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা ছাড়াও আরও কয়েকজন তার সঙ্গে জড়িত। তদন্তের স্বার্থে নামগুলো আমরা এখনই প্রকাশ করতে পারছি না। তবে আশা করছি- শীঘ্রই অভিযুক্ত সবাইকে গ্রেফতার করতে পারবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com