ব্যাংক ঋণ অবলোপনের আদায় ১ শতাংশ!

Screenshot_1-1.jpg

সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ অবলোপন বাড়লেও আদায় পরিস্থিতি খুবই নাজুক। বিপুল অঙ্কের এই অবলোপন থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মোট অবলোপন স্থিতি ৪৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা থেকে ৯৯ শতাংশ ঋণই আদায় হয়নি।

২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন হাজার ৪৮২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো। যা ২০১৯ সালের একই সময়ে ছিল মাত্র ৯৫৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নতুন করে ঋণ অবলোপন বেড়েছে দুই হাজার ৫২৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ অবলোপনই বেসরকারি ব্যাংকের। হঠাৎ বেসরকারি ব্যাংকে অবলোপন অনেক বেড়ে গেছে। এভাবে অস্বাভাবিক ঋণ অবলোপনের পথে হাঁটছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, প্রভাবশালীদের খেলাপি ঋণ অবলোপন হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে পরিচালকদের যোগসাজশের ঋণ এবং বেনামি ঋণ, যা কখনো আদায় হয় না; সেসব ঋণই অবলোপনে গুরুত্ব পায়।

এসব মন্দ ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। সে ট্রাইব্যুনালের আওতায় প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণ খেলাপির বিচার করতে হবে। তা না হলে বিপুল অঙ্কের এই খারাপ ঋণ আদায় করা সম্ভব হবে না।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বড় এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের টাকা আদায় হবে না।

সে কারণেই ৯৯ শতাংশ অনাদায়ী। শুধু নিয়মিত নয়, ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো মামলাও ঝুলে আছে অর্থঋণ আদালতে। এর পেছনে মোটা অঙ্কের টাকা এবং খুঁটির জোর কাজ করে। তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এ টাকা আদায় হবে না।

এর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করার সুযোগ নেই। প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণ খেলাপিকে এই ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে বিচার করলে অবলোপনের টাকা ফেরত চলে আসবে।

কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বরং উল্টো ঋণখেলাপিদের একের পর এক সুবিধা দিতে দেখা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংক ঋণ অবলোপন থেকে আদায় করেছে মাত্র ০.৯৩ শতাংশ, বেসরকারি ৪০ ব্যাংক ১ দশমিক ১৬ শতাংশ, বিদেশি ৯ ব্যাংক ০.২৭ শতাংশ এবং বিষেশায়িত ৩ ব্যাংক আদায় করেছে ০.৬২ শতাংশ।

জানতে চাইলে একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার যুগান্তরকে বলেন, নিয়মিত টাকাই আদায় হচ্ছে না, অবলোপন তো পরের বিষয়। তা ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের টাকা অবলোপন করা হয়।

বিশেষ করে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালকরা যেসব বেনামি ঋণ নেন, সে টাকা তো আর ফেরত আসে না। সেটাই অবলোপনে গুরুত্ব পায়। তবে ঋণ অবলোপন পদ্ধতির উদ্দেশ্য ভালো ছিল, কিন্তু এখন প্রয়োগ পদ্ধতি খারাপের দিকে চলে গেছে।

জানা গেছে, কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে বিপুল অঙ্কের ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো। ২০২০ সালে অবলোপনের মাধ্যমে ছয় হাজার ৫৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

যা ২০১৯ সালে ছিল দুই হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ অবলোপন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের স্থিতি ৪৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। আর ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকের স্থিতিপত্রে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।

অবলোপন করা ঋণ যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় এক লাখ ৩২ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিল এবং ঋণ পুনর্গঠন যোগ করলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক অনেক বেড়ে যাবে।

আদায় না করেই ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা ছাড় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনার কারণে গত বছর কেউ ঋণ ফেরত না দিলেও খেলাপি না করার সিদ্ধান্তের আগে ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ৫২ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।

এর আগে কোনো গ্রাহকের ৫০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণ বিশেষ সুবিধায় ১৫ হাজার কোটি টাকা পুনর্গঠনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে।

ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দ মানে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রেখে স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। ঋণ গ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপি হিসাবে বিবেচিত হন।

তবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হিসাবে তা দেখানো হয় না। বর্তমানে কোনো মামলা ছাড়া ব্যাংকগুলো দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপন করতে পারে।

যেসব ঋণ নিকট ভবিষ্যতে আদায়ের সম্ভাবনা নেই এবং মন্দমানে খেলাপি হওয়ার অন্তত তিন বছর পার হয়েছে ব্যাংকগুলো কেবল তা অবলোপন করতে পারে। অবলোপন করে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে অবলোপন করা ঋণের বেশির ভাগই ছিল বেসরকারি ব্যাংকের। গত বছর বেসরকারি ব্যাংকগুলো পাঁচ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করে। যা মোট অবলোপনের ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে এক হাজার ৩৭০ কোটি টাকা বা মোটের ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাকি ৩৩ কোটি টাকা অবলোপন হয়েছে বিদেশি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয়।

অবলোপন ব্যাপক বাড়লেও এ থেকে ঋণ আদায় কমেছে। ২০১৯ সালে যেখানে অবলোপন করা ঋণ থেকে ৮৩১ কোটি টাকা আদায় হয়। গত বছর তা ৭৪৬ কোটি টাকায় নেমেছে।

একসময় শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ব্যাপক ঋণ অবলোপনের সংস্কৃতি ছিল। খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সহজ উপায় হিসাবে এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এ পথে হাঁটছে বলে মনে করেন অনেকে।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো অবলোপন থেকে সরে এসে ঋণ আদায়ে জোর দিচ্ছে। সে কারণে সরকারি ব্যাংকে ঋণ অবলোপন কম হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অবলোপন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।

বিশেষায়িত ব্যাংকে এক হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে স্থিতি ২৫ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকে ৩৭৫ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ব্যালেন্সশিট পরিষ্কার করার জন্য অবলোপন করা হয়। এটা নিয়মের মধ্যেই আছে।

বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে, আদায় কমেছে। তাই সাময়িক চাপ সামলাতে হয়তো তারা এ পথে হাঁটছে।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অবলোপন আর বাড়বে না। যা করার আগে করা হয়েছে।

এখন আদায়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন বাড়ছে, তাই তাদের অবলোপনযোগ্য ঋণের অঙ্কও বেশি। সে কারণে বেসরকারি ব্যাংকের অবলোপন বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com