সিলেটে নেতাগণ মানছেন না লকডাউনের নির্দেশনা

hbb.jpg

বিয়ে করে কনে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে ফিরছিলেন বর। সড়কে তাদের গাড়ি আটকায় পুলিশ। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন বরকে। তার অপরাধ শাটডাউনের নির্দেশনা ভেঙে বিয়ে করা।

শুক্রবার বিকেলে সিলেট নগরের হুমায়ুন রশীদ চত্বর এলাকায় এমন ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনার কয়েক ঘন্টা আগে শুক্রবার দুপুরে ফেসবুকে কয়েকটি বিয়ের ছবি আপ করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াসুর রহমান ইলিয়াস। ছবিগুলোর ক্যাপশনে লিখেন ‘গতকাল বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানে’।

লকডাউন ঘোষণার প্রথম দিন ইলিয়াসের ওয়ার্ডে এই বিয়েগুলো সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। লকডাউনের মধ্যে আয়োজিত এসব বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলর ইলিয়াস।

সবগুলো বিয়েতে কর-কনেসহ অতিথিদের সাথে ছবিও উঠেন তিনি। নিজের ফেসবুকে দেওয়া এসব ছবিতে দেখা গেছে কাউন্সিলর ইলিয়াসসহ কারো মুখেই মাস্ক নেই।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বৃহস্পতিবার থেকে সারাদেশে ৭ দিনের লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। বুধবার জারি করা লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে ২১ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়।

এতে উল্লেখ রয়েছে- জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, জন্মদিন, পিকনিক পার্টি ইত্যাদি), রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে’। লকডাউনের নির্দেশনা কার্যকরে বৃহস্পতিবার থেকেই সারাদেশের মতো সিলেটে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশ্খৃলা বাহিনী, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। মাঠে রয়েছে ভ্রাম্যমান আদালতও। কেউ অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হলেই মামলা-জরিমানা করা হচ্ছে। বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও জরিমানা গুণতে হচ্ছে। গত দুই দিনে সিলেট জেলায় অন্তত চারশ’ জনকে প্রায় ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

ঘরের বাইরে বের হয়েই মামলা ও জরিমানার মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এবং জনপ্রতিনিধিরা লকডাউনের নিদের্শনা ভেঙে ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। জনসমাগম করে নির্বাচনী প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। এইসব নেতাদের ব্যাপারে এখনো উদাসীন প্রশাসন।

লকডাউনের প্রথম দুদিন নগরীতে সিটি মেয়র আরফিুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে উপস্থিত ছিলেন সিটি কাউন্সিলররাও।

সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে নিজেই লকডাউনের নিদের্শনা ভেঙে বিয়ের আয়োজনে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে কাউন্সিলর ইলিয়াসুর রহমান ইলিয়াস বলেন, ‘জাকজমক বিয়ে নয়, আসলে ঘরোয়া অনুষ্ঠান ছিল। আমার ওয়ার্ডোর বিয়া এরলাগি একটু দেখা দিয়া আইছি। যাওয়ার লাগি যাওয়া আরকি।’

বুধবার ছিলো যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের জন্মদিন। এ উপলক্ষ্যে শুক্রবার দুপুরে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গনে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে সিলেট মহানগর যুবলীগ।

মহানগর যুবলীগের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি, সাধারণ সম্পাদক মুশফিক জায়গীরদার ছাড়াও সিলেট মহানগর যুবলীগ ও ২৭টি ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক সহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

নিষেধাজ্ঞ সত্ত্বেও লকডাউনের মধ্যে এরকম অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি বলেন, ‘বিধি নিষেধ ঠিক আছে। আমরা অল্প মানুষ দরগাত দোয়া করছি। এরপরে বাইরে গরীব, অসহায় ছিন্নমূল মানুষের মাঝে আমরা আম, মাস্ক বিতরণ করেছি। মূলত গরীব মানুষকে সাহায্য করতেই উদ্যোগ নেওয়া হয়।’

বৃহস্পতিবার ছিলো হয়রত শাহজলাল (র.) এর ৭০২তম ওরস শরিফ। করোনা সংক্রমণ বাড়ারর কারণে আগেই ওরসের সকল আনুষ্ঠানিকতা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলো মাজার কতৃপক্ষ। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয় লকডাউন।

তবে লকডাউনের নির্দেশনা উপক্ষো করে বৃহস্পতিবার অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে শাহজালাল মাজারের ওরসে উপস্থিত হন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সিলেট-২ আসনের সাবেক সাংসদ শফিকুর রহমান চৌধুরী। মাজারে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে গিলাফ প্রধান করেন তিনি।

ওরসে নেতাকর্মী নিয়ে হাজির হওয়া ও গিলাফ ছড়ানোর কিছু ছবি ওইদিনই নিজের ফেসবুকে পোস্ট করে শফিক। ছবির সাথে ক্যাপশনে লেখেন- ‘হযরত শাহ জালাল (রহ,) ৭০২তম পবিত্র  উরস শরীফ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার পক্ষে মাজারে গিলাফ ছড়াচ্ছি….কবির উদ্দিন আহমদ,সৈয়দ এপতেয়ার হোসেন পিয়ার, আলম খান মুক্তি, শেখ জালাল ফরিদ উদ্দিন, কবিরুল ইসলাম কবির, হোসিয়ার আলম সহ নেতৃবৃন্দকে নিয়ে…’।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে শুক্রবার রাতে শফিুকর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘দরগাত ইটা তারা (দরাগাহ কর্তৃপক্ষ) দিছইন, আমরাও দিছি একটা রাতে। এটাত কোনো অসুবিধ নাই। তবে না দেওয়াটা ভালা। খাদেম একজনে লইয়া রাখছইন। এটা আসলে ভুলই হয়ে গেছে। খেয়াল করছি না। বাদ দিলাইন, এটা লইয়া নিউজ করার দরকার নাই।’

আগামী ২৮ জুলাই সিলেট-৩ আসনে উপ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। লকডাউন চলাকালে সব ধরণের প্রচারণা বন্ধ রাখতে এখানকার প্রার্থীদের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুদিনই নিজের নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন মসজিদে যান হাবিব। নামাজ আদায় শেষে তিনি মসজিদে আসা সকলের সাথে কুশল বিনিময় করেন। তাদের উদ্যোশে বক্তৃতাও দেন। নেতাকর্মী নিয়ে মাজারও জিয়ারত করেন। তবে এসব কর্মসূচীর কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি।

বৃহস্পতিবার লকউনের প্রথমদিন বিকেলে নিজ নির্বাচনী এলাকা দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি এলাকায় যান হাবিবুর রহমান হাবিব। সন্ধ্যায় বরইকান্দি ইউনিয়নের রায়েরগ্রাম জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। এসময় মসজিদে জড়ো হওয়া মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন হাবিব।

রাতে নিজের ফেসবুকে কুশল বিনিময়ের একাধিক ছবি আপ করেন তিনি। এতে দেখা যায়, হাবিবসহ উপস্থিত প্রায় কারো মুখে মাস্ক নেই। সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা না মেনে সবাই গাদাগাদি করে আছেন।

অথচ গত বুধবার কঠোর লকডাউন চলাকালে মসজিদে নামাজ আদায়ে যেতে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৯টি নির্দেশনা দেয়া হয়।

এতে বলা হয়- মসজিদের ঢোকার মুখে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান-পানি রাখতে হবে এবং আগত মুসল্লিদেরকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে।

প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে ওযু করে, সুন্নাত নামাজ ঘরে আদায় করে মসজিদে আসতে হবে এবং ওজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। নামাজের কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

তবে হাবিবকে রায়েরগ্রাম জামে মসজিদে মুসল্লিদের সাথে কুশল বিনিময়কালে এসব নির্দেশনা মানতে দেখা যায়নি।

এরপর শুক্রবার ফেঞ্চুগঞ্জের রাজনপুর জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেন হাবিব। ওইদিনও নামাজ শেষে তিনি মুসল্লীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন। এরপর তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে হযরত ইসহাক আলী শাহ্ (রঃ)ও হযরত শাহ্ সৈয়দ আলী (রঃ), হযরত গোলাপ শাহ্ (র.) মাজার জিয়ারত করেন।

বৃহস্পতিবার রায়েরগ্রাম জামে মসজিদে উপস্থিত থাকা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, মসজিদে নামাজ শেষে জনাপঞ্চাশেক লোক হাবিবকে ঘিরে ধরেন। তারা সামাজিক দূরত্ব না মেনেই জড়ো হন এবং করমর্দন করেন। এদের বেশিরভাগের মুখেই মাস্ক ছিলো না। এমনকি হাবিবের মাস্কও মুখের বদলে থুতনিতে লাগানো ছিলো। এরপর উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ভোট চেয়ে বক্তৃতাও দেন হাবিব।

এ ব্যাপারে সিলেট-৩ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে রাতে হাবিবের ই-মেইল আইডি থেকে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মসজিদে জড়ো হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুসল্লীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন হাবিব’।

এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে লকডাউনের নির্দেশনা অমান্য করে দক্ষিণ সুরমার একটি কমিউনিটি সেন্টারে হাবিবুর রহমান হাবিবের সমর্থনে সেন্টার কমিটি গঠনের জন্য সভা হয়। এতে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী অংশ নেন।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের একাংশ নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনের এমপি আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী চলতি বছরের ১১ মার্চ করোনায় সংক্রমিত অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। এরপর ১৫ মার্চ এটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com