‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, দেনার চিন্তায় ঘুম আসে না’

121752.jpeg

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে কঠোর লকডাউন চলছে। লকডাউনে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ।

প্রথমে ১ জুলাই থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত ঘোষণা আসে কঠোর বিধিনিষেধের। পরে সংক্রমণের হার না কমায় বিধিনিষেধের মেয়াদ আরও ৭ দিনের বৃদ্ধি করা হয় যা চলবে আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত। কিন্ত এতদিন ঘরবন্দি হয়ে থাকলে সংসার চলবে না সুমন ঋষির। বাবা-মা স্ত্রী ও দুই প্রতিবন্ধি ছেলেকে নিয়েই তার সংসার। হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরী বাজারে জুতা সেলাইর কাজ করেন সুমন। থাকেন হবিগঞ্জ শহরের গোসাইনগর এলাকায়। জুতা সেলাইয়ের কাজ করে বর্তমানে প্রতিদিন ১শ’ থেকে দেড়শ টাকা ইনকাম হয়। এ আয়ে চলে না বাবা মা ও দুই প্রতিবন্ধি ছেলের চিকিৎসা খরচই চলে না। তাই লকডাউনেও পেটের দায়ে বাইরে বেরুতে হয়।

শনিবার বিকেলে কথা হলে সুমন ঋষি বলেন, ‘সকালে কাঁঠাল আর চিড়া খেয়ে বের হয়েছি। এখন পর্যন্ত কিছুই খাইনি। ঘড়ি বাজে ৫টা। মাত্র একশ টাকা ইনকাম হয়েছে। বাসায় মা-বাবা আর দুই ছেলে অসুস্থ।’

সুমন বলেন, ‘শুধু দুই ছেলের মাসে ৪ হাজার ৮০০ টাকার ঔষধ লাগে। মা-বাবার ওষুধ আরও প্রায় ৩ হাজার টাকা। সর্বমোট ৭ হাজার ৮০০ টাকার ঔষধই লাগে। কিন্তু আমার ইনকাম বর্তমানে ১শ থেকে দেড়শ টাকা। পরিবারে আমার রুজি ছাড়া অন্ন যোগানোর কেউ নাই; এখন আপনিই বলেন আমি কী করব। একছেলে একবেলা ঔষধ না খেলেই চোখে দেখে না। আর আরেক ছেলের পায়ে সমস্যা তাকেও নিয়ম করে ঔষধ দিতে হয়। বাবার কাশির সমস্যা। বাবাকে ওষুধ দিতে পারি না তিনি এখন কাশির যন্ত্রণায় শ্বাস নিতে পারেন না।’

কথা বলছেন আর চোখের কোণের জল মুছে সুমন বলেন, ‘ভাই করোনা আর লকডাউন আমাদের মতো গরিবকে মারার জন্য এসেছে। আগে প্রতিদিন ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকা রুজি হয়েছে। কিন্তু এখন ১শ টাকা। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লোন নিয়েছি ৫৬ হাজার টাকা। মানুষজন বাজারে নাই, কাজ ও আগের মতো হয় না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। রাত হলে ধার দেনার চিন্তায় ঘুমে ধরে না।’

সুমনের মতোই লকডাউনে বিপাকে পড়া বাবুল মিয়া নামের আরও একজনের সাথে কথা হয়। বাবুলের দেশের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। ৫ বছর ধরে হবিগঞ্জে ভ্যানে করে বিভিন্ন ফল ও সবজির ব্যবসা করেন। থাকেন শহরের ২নং পুল এলাকার একটি ভাড়াবাসায়।

সুমন অর্ধশিক্ষিত, বেলা ২টার দিকে ডাকঘর এলাকায় ভ্যানে করে কলা নিয়ে দাঁড়িয়ে একটি জাতীয় দৈনিক পড়ছিলেন। এ সময় কথা হলে তিনি বলেন, করোনায় আমার যে ক্ষতি হয়েছে তা আরও এক বছরে পোষাতে পারবো না। গ্রামের বাড়িতে মা-বাবা স্ত্রী ছোট দুই ছেলে। হবিগঞ্জ থেকে আমার মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা লাগে। আর বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঔষধ লাগে ৪ হাজার টাকার এ ছাড়া ছোট বাচ্ছাদের ঔষধ ও খাবারে লাগে আরও প্রায় ২ হাজার টাকা।

সুমন বলেন, বর্তমানে কলা বিক্রি করে আমার দৈনিক আয় হয় ২ থেকে আড়াইশ টাকা। আর আগে ৫ থেকে ৬শ টাকা আয় হতো। লকডাউনের কারণে মানুষ তেমন বের হতে পারে না। তাই আগের মতো বিক্রিও হয় না। পরিবার চালাচ্ছি ধার-দেনা করে।

তিনি বলেন, পত্রিকায় করোনার খবর পড়ছিলাম, যে হারে মানুষ মরতেছে আর সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এ অবস্থা থাকলে দেশে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। সরকারের লকডাউনের সিদ্ধান্তকে আমি সঠিক মনে করি কিন্তু এই লকডাউন আমাদের মতো মানুষের পালন করা খুব কঠিন। ঘরে খাবার না থাকলে তো আর মানুষ বের হতেই হবে।’

হবিগঞ্জে সুমন-বাবুলের মতো আরও আনেক মানুষ এভাবে লকডাউনে ধার-দেনা করে চালাচ্ছেন সংসার।

এদিকে শনিবার (১০ জুলাই) হবিগঞ্জে সর্বোচ্চ করোনা আক্রন্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুখলেছুর রহমান উজ্জ্বল বলেন, শনিবার হবিগঞ্জে ২২২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছেন। শনাক্তের হার ৩৯.১ শতাংশ।

এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়েছেন  ৩ হাজার ১৭০ জন, সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ১২৯ জন। এছাড়াও করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ২২ জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com