কুলাউড়ায় খাসিয়াদের পানপুঞ্জি ধ্বংস করে সামাজিক বনায়ন!

kllll.jpeg

কুলাউড়ার ডলুছড়া পুঞ্জির পানজুমে সামাজিক বনায়নের প্রকল্প গ্রহণ করেছে বনবিভাগ। প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে সামাজিক বনায়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খাসিয়াদের পান বাগান ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এই পুঞ্জির অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে জীবিকার সঙ্কটে পড়তে পারেন খাসিয়া পুঞ্জির ৫০ পরিবারের অন্তত ৩শ’ সদস্য।

খাসিয়াদের অভিযোগ, ডলুছড়া পানপুঞ্জির জুমে সামাজিক বনায়ন করতে ছোট কালাইগিরিতে উপকারভোগীরা একটি ক্যাম্প স্থাপন করছে। সম্প্রতি মুরইছড়া বনবিটের বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার উপকারভোগীদের নিয়েই সেখানে যান এবং তারই উপস্থিতিতেই জুমের পান গাছ কাটা হয়।

এদিকে বিট কর্মকর্তা জানান, ডলুছড়ায় সামাজিক বনায়নে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমোদন রয়েছে। আর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখনও তিনি অনুমোদন দেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের ডলুছড়া পানপুঞ্জি ও জুম এলাকায় বনের জমি রয়েছে। সেখানে খাসিয়ারা দীর্ঘদিন থেকে বংশ পরম্পরায় পান চাষসহ বিভিন্ন ধরণের ফলের আবাদ করে আসছেন। ডলুছড়া পানজুম এলাকায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক বনজ ও ফলজ গাছ রয়েছে।

খাসিয়া বাসিন্দারা জানান, সামাজিক বনায়ন করলে ধ্বংস হয়ে যাবে প্রাকৃতিক বন। কেটে ফেলা হবে পান গাছ।

ডলুছড়া পানপুঞ্জির পানজুম দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। খাসিয়ারা জানান, পানজুমের নিরাপত্তার স্বার্থে জুমের নিচ এলাকার সীমানা দিয়ে বনজঙ্গল রাখতে হয়। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পূর্বে জুমের নিচের বনজঙ্গল ও গাছপালা কেটে সেখানে সামাজিক বনায়নের নামে গাছের চারা লাগাতে গর্ত করা হয়েছে। প্রায় এক মাস পূর্বে ওই জুম এলাকার পান ও বিভিন্ন প্রকারের গাছও কর্তন করা হয়েছে। এমনকি সেখানকার বাঁশ ও গাছ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

খাসিয়ারা জানান, এভাবে জুমের জায়গা আস্তে আস্তে সামাজিক বনায়নের নামে দখল করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, বনবিভাগের লোকজন গাছ কেটে উল্টো মিথ্যা মামলায় তাদেরকে ফাঁসানো হচ্ছে।

জানা গেছে, ডলুছড়া পানজুমে সামাজিক বনায়নের নামে কর্মধা ইউনিয়নের টাট্টিউলী ও গনকিয়া গ্রামের ধর্নাঢ্য পরিবারের লোকজন উপকারভোগীর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। এরমধ্যে আছেন, পূর্বটাট্টিউলি গ্রামের মৃত আব্দুস ছত্তারের ছেলে রফিক মিয়া, বশির মিয়া, একই গ্রামের হারুন মিয়া, উস্তার মিয়া, হারিছ আলী, ইসরাইল আলী, সাতির আলী, সাতির মিয়া ও গনকিয়া গ্রামের মুসলিম মিয়া।

খাসিয়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, পূর্বটাট্টিউলি গ্রামের রফিক মিয়া গত বছর ইছাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা জেসপার আমলরংয়ের কাটাবাড়ি জুম দখল করেন। পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় জুমটি দখলমুক্ত হয়। এই রফিক মিয়ার একটি পানজুম বর্তমানে বেলকুমা পুঞ্জিতে (ফানাই পুঞ্জি) রয়েছে। আর বেলকুমা পুঞ্জির পাশেই ডলুছড়া পানপুঞ্জির জুম অবস্থিত। সেই হিসেবে সামাজিক বনায়নের নামে রফিক বাহিনী ডলুছড়া পানপুঞ্জির জুমও তাদের দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সরেজমিন ডলুছড়া পুঞ্জির পানজুমে গেলে দেখা যায়, জুমের ভিতর তাবু টানিয়ে খাসিয়া পরিবারের লোকজন পুঞ্জি এলাকা পাহারা দিচ্ছেন।

আলাপকালে পুঞ্জির বাসিন্দা তিমন খাসিয়া বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা দীর্ঘদিন থেকে পুঞ্জিতে বসবাস করে আসছেন। পানজুমে ২০/২৫ বছর আগের পুরনো বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ জড়িয়ে আছে পানগাছ। পান ছাড়া খাসিয়াদের আর তেমন কোন আয়ের পথ নেই। কিন্তু আমাদের পান গাছ কাটা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের নামে অন্যান্য জাতের গাছ কাটা হয়েছে। বস্তির লোকজনদের দিয়ে এইসব গাছ কেটে বনবিভাগের লোকজনই অন্যত্র বিক্রি করছে। প্রতিবাদ করলেই আমাদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দিয়ে অযথা হয়রানি করে।

এই পুঞ্জির বাসিন্দা ময়মনসিংহ নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী রনাল্ডো লাম্বা ও ঢাকা নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী ফাইমন সুঙ বলেন, “গত দুই সপ্তাহ থেকে আমরা জুমে বৃষ্টিতে ভিজে পাহারা দিচ্ছি। সুবিধাভোগিরা যেকোন সময় জুমে উঠতে পারে। আমরা চাই না, এভাবে জুমের পান ও গাছ কাটা হোক। কারণ, গাছ পুড়ে যাওয়ায় আমাদের সম্পদ পুড়ানো হচ্ছে”।

পুঞ্জির হেডম্যান লবিং সুমের অভিযোগ করে বলেন, মুরইছড়া বনবিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার তাদের জানিছেন, জুম এলাকায় সামাজিক বনায়নের কাজে বাধা দিলে জুমের সব পানগাছ কেটে ফেলা হবে এবং খাসিয়াদের নামে মামলা দেওয়া হবে। এমনকি এখান থেকে তাদেরকে (খাসিয়াদের) উচ্ছেদ করারও ভয় দেখিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় এক আদিবাসী নেত্রী জানান, পানপুঞ্জির পানচাষী ও বসবাসকারী খাসি আদিবাসীরা স্বত্ববান দখলদার থাকার মর্মে আদালত ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রায় ও একই সালের ৫ অক্টোবর ডিক্রী প্রদান করেন। বর্তমানে স্বত্ব মামলা চলমান আছে। কিন্তু খাসিদের পুঞ্জি ও আশপাশে প্রাকৃতিক বন এবং স্বত্ব মামলা থাকার পরও সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের নামে স্থানীয় বনবিভাগ ডলুছড়া পুঞ্জিতে সামাজিক বনায়ন করছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় নারী বিষয়ক সম্পাদক ফ্লোরা বাবলী তালাং জানান, পানজুম এবং পরিবেশ রক্ষার্থে খাসিয়ারা তাদের প্রথাগত জ্ঞানে ৫ থেকে ১০ বছর পানজুমকে সংরক্ষণ করে রাখে। যাতে জুমের ওই গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বনবিভাগ সামাজিক বনায়ন করার চেষ্টা করছে। এটি খাসিয়াদের উচ্ছেদের একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরো জানান, এখানে প্রাকৃতিক গাছপালা কেটে কৃত্রিম বন কিংবা সামাজিক বনায়ন হলে শুধু খাসিয়া নয়, বন, পরিবেশ ও প্রতিবেশও হুমকির সম্মুখিন পড়বে। তিনি ডলুছড়া পানপুঞ্জির জুম ও প্রাকৃতিক বন রক্ষা এবং সেখানে সামাজিক বনায়ন না করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।

মুরইছড়া বনবিটের কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার জানান, তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ মোটেও সত্য নয়। তবে উপকারভোগীদের নিয়ে তিনি সামাজিক বনায়নের কথা স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, এখানকার উপকারভোগীদের নামের তালিকাও আছে। ডলুছড়ায় সামাজিক বনায়নের জন্য সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন প্রেরণ করা হয়েছে এবং ওই বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সেটি অনুমোদনও পেয়েছে বলে জানান বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদার।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, সামাজিক বনায়ন করতে হবে খালি জায়গায়। যেখানে প্রাকৃতিকভাবে গাছপালা আছে সেখানে এসবের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তবে বিষয়টি সুরাহার জন্য দুয়েক দিনের মধ্যে তিনি বনবিভাগ, ডলুছড়া পুঞ্জির খাসিয়া নেতৃবৃন্দ, উপকারভোগী ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে বসবেন বলেও জানান।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, কুলাউড়ায় অনেক সামাজিক বনায়ন হয়েছে। ডলুছড়ায় সামাজিক বনায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারছি না।

তিনি বলেন, সামাজিক বনায়নের জন্য আগে জায়গা নির্ধারণ করা হয়। জায়গা নির্ধারণ, উপকারভোগীদের বিষয়টি উপজেলা বন কমিটি ও রেঞ্জার দেখবেন।

তিনি বলেন, তার অনুমোদনের পর সামাজিক বনায়নের প্রকল্প চূড়ান্ত হয়। তিনি এরকম কিছু এখনও পাননি এবং অনুমোদনও দেননি বলে জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com