সিলেট ছাত্রলীগে টান টান উত্তেজনা

312212.jpeg

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এলো সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি। বহুল কাঙ্ক্ষিত কমিটি নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার কথা ছিল নেতাকর্মীদের। কিন্তু হয়েছে উল্টোটা। উভয় শাখায় দুই শীর্ষ পদে দায়িত্বশীলদের নাম কেন্দ্র থেকে ঘোষণার পরই বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে সিলেট ছাত্রলীগে। চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। ওঠেছে ‘কোটি টাকায় কমিটি বিক্রির’ অভিযোগও। ঘটেছে হামলার ঘটনাও। পরিস্থিতি এখন তাই টান টান উত্তেজনায় ভরপুর।

ঠিক এরকম অবস্থায় আজ বুধবার বিকালে সংবাদ সম্মেলন করতে যাচ্ছেন বিদ্রোহীরা। এ সংবাদ সম্মেলন থেকে তাদের পরবর্তী কর্মসূচির ডাক আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কমিটি পক্ষ পূজার পর পরই বড় আকারের শোডাউনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে চাইছেন।

জানা গেছে, সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সবশেষ কমিটি হয় ২০১৪ সালে। বিতর্কের পাহাড় গড়ে ওঠায় সেই কমিটি ২০১৭ সালের অক্টোবরে বিলুপ্ত করে দেয় কেন্দ্র।

অন্যদিকে, মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি হয় ২০১৫ সালে। কিন্তু সে কমিটিও পারেনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে। লাগামহীন বিতর্কের কারণে ২০১৮ সালের অক্টোবরে বিলুপ্ত করা হয় সেই কমিটি।

এরপর থেকেই সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগ ছিল নেতৃত্বহীন। পদপ্রত্যাশীরা ছিলেন কমিটির জন্য অপেক্ষায়। মাঝে একবার পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু কমিটির দেখা মেলেনি। সবমিলিয়ে হতাশার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল সিলেট ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগ সূত্র জানিয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেটে ছাত্রলীগকে সক্রিয় ও গতিশীল করে তুলতে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই প্রেক্ষিতে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্বশীলদের নাম কাল মঙ্গলবার ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

সিলেট জেলা ছাত্রলীগে মো. নাজমুল ইসলামকে সভাপতি আর রাহেল সিরাজকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছেন কিশওয়ার জাহান সৌরভ, সাধারণ সম্পাদক নাঈম আহমদ।

জানা গেছে, নাজমুল ইসলাম টিলাগড় গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। রাহেল সিরাজ তেলিহাওর গ্রুপের। দর্শনদেউড়ি গ্রুপ থেকে সৌরভ এবং কাশ্মীর গ্রুপ থেকে নাঈম দায়িত্ব পেয়েছেন।

তেলিহাওর গ্রুপের রাহেল সিরাজ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেলেও গ্রুপের অভ্যন্তরে দেখা দেয় তীব্র ক্ষোভ। এ গ্রুপের একটি অংশ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খানকে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে এ পদে না দিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য করা হয়েছে। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পরই তিনি সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য করা হয়েছে জাওয়াদ ইবনে জাহিদ খান, বিপ্লব কান্তি দাস, মুহিবুর রহমান মুহিব, কনক পাল অরূপ, হোসাইন মোহাম্মদ সাগর ও সঞ্জয় পাশী জয়কে। কিন্তু জাওয়াদ ছাড়াও মুহিবুর রহমান এই পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। মুহিব জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি পদে আসতে আগ্রহী ছিলেন।

কেন্দ্রীয় সদস্য হওয়া হোসাইন মোহাম্মদ সাগর পুলিশ অ্যাসল্ট মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি। বিভিন্ন অভিযোগে তাকে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

সবমিলিয়ে কমিটিকেন্দ্রীক অসন্তোষ ঘিরে ধরেছে সিলেট ছাত্রলীগকে। এ নিয়ে জল আরও ঘোলা হওয়ার পূর্বাভাস মিলছে।

কমিটি ঘোষণার বিষয়টি জানার পরই কাল মঙ্গলবার সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। তেলিহাওর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে নগরীর জিন্দাবাজার আল-হামরা মার্কেটের সামনে পৌঁছার পর পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশী বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি সামনে অগ্রসর হয়। চৌহাট্টা পয়েন্টে গিয়ে বিক্ষোভকারী নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। সেখানে বেশকিছু সময় অবস্থান করেন তারা।

পরে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ অভিযোগ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৩০ লাখ টাকা করে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা নিয়ে কমিটি বিক্রি করা হয়েছে।’

কাল সন্ধ্যার দিকে নগরীর আম্বরখানা বড়বাজারস্থ রাহেল সিরাজের বাসায় ঢিল ছুঁড়ার ঘটনা ঘটে। রাহেল সিরাজের ভাই গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রুমেল সিরাজ অভিযোগ করেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরীয়ার আলম সামাদ, মহানগর শাখার সাবেক সহ-সভাপতি সুজেল তালুকদার ও যুবলীগ নেতা দুলাল আহমদের নেতৃত্বে ১০-১৫টি মোটর সাইকেলে ৩০-৩৫ জন যুবক তার বাসায় হামলা চালান। এসময় তাকে বাইরে পেয়ে তার উপরও হামলার চেষ্টা করা হয়। তিনি দৌড়ে বাসায় ঢুকে আত্মরক্ষা করেন। এরপর হামলাকারীরা বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যান।

তবে এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন তেলিহাওর গ্রুপের শাহরিয়ার আলম সামাদ।

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়া নাজমুল ইসলাম এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণে জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীদের নেতা বলে অভিযোগ ওঠেছে। ওই ঘটনার পর নাজমুলের সঙ্গে ওই অপরাধীদের বেশ কয়েকটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এ প্রসঙ্গ শাহরিয়ার আলম সামাদ বলেন, ‘জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এমন একজনকে করা হয়েছে…আপনারা সবাই জানেন, কিছুদিন আগে এমসি কলেজে আলোচিত যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, যারা জড়িত ছিল তাদের মূলহোতা সে (সভাপতি নাজমুল)।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক পদ এমন একজনকে (রাহেল সিরাজ) দেওয়া হয়েছে, যে এইট পাস করছে কিনা আমি জানি না। পাঁচশালা (পঞ্চম শ্রেণি) পাস করে স্কুলের দ্বারপ্রান্তে গেছে কিনা, জানা নেই। সে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় রাজনীতি করতো। আমার কাছেও বহুবার এসেছিল, উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে ঢুকার জন্য। তার কোনো ছাত্রত্ব নেই, ফাইভ পাস করে আর স্কুলে যায়নি। এজন্য আমি তাকে না করে দিয়েছিলাম। সে অসংখ্য চেক ডিজওনার মামলার আসামি।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে কথা বলতে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রাহেল সিরাজ সিলেটভিউকে বলেন, ‘আমি ২০১১ সালে এসএসসি এবয় ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করি। বর্তমানে আমি সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে  ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়নরত।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে কমিটি এসেছে। এ নিয়ে ছোটখাটো প্রতিক্রিয়া হওয়াটা স্বাভাবিক। বৃহৎ সংগঠনে এমনটা হয়ে থাকে। এগুলো আমরা স্বাভাবিকভাবেই দেখছি। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর দু-একজন ছাড়া বাকি সবাই কিন্তু কমিটি পেয়ে আনন্দিত। বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ মিছিলও হয়েছে, আরও হবে।’

কমিটির কার্যক্রম শুরুর প্রসঙ্গে রাহেল সিরাজ বলেন, ‘এখন পূজার সময়। আমরা যদি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে যাই, তাহলে অসংখ্য নেতাকর্মী জড়ো হবেন। বড় কর্মসূচি হবে। তাতে সনাতন ধর্মের মানুষের সমস্যা হতে পারে। এজন্য পূজা গেলে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে নিয়ে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করবো।’

এদিকে, কমিটির বিদ্রোহী পক্ষ, তেলিহাওর গ্রুপের নেতাকর্মীরা আজ বুধবার বিকালে সিলেটে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ বলেন, ‘আমি সর্বশেষ জেলা কমিটির সভাপতি। কমিটি গঠন নিয়ে গত চার বছরের নানা রকম চেষ্টার আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী। চার বছর পর মাত্র চারজনকে দায়িত্ব দিয়ে নতুন নেতৃত্ব কেনা হয়েছে। এতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি লিখিত অভিযোগ করার আগে সংবাদ সম্মেলন করে পুরো বিষয়টি তুলে ধরব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com