দুর্গা পূজার ছুটি ও প্রাসঙ্গিক কথা

126073.jpeg

শারদীয় দুর্গোৎসব, সনাতন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু পাঁচ দিনের এই পূজায় সরকারি ছুটি আছে মাত্র একদিন। তাও আবার পূজার শেষ দিন অর্থাৎ বিজয়া দশমীর দিনে।

সনাতন সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবি, পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবে কমপক্ষে তিন দিন পর্যন্ত সরকারি ছুটি বাড়ানো হোক। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, শারদীয় দুর্গা পূজায় তিন দিনের ছুটির জন্য বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ দীর্ঘদিন থেকে দাবি করে আসলেও অদ্যাবধি এটি বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। আসলে এটি দাবিই বা করতে হবে কেন? এটি তো আমাদের ন্যায্য অধিকার।

শারদীয় দুর্গাপূজার পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় মূলতঃ বিল্ব ষষ্ঠি তিথি থেকে এবং শেষ হয় বিজয়া দশমী তিথির মধ্য দিয়ে। আর এই আবহমানকালের ঐতিহ্যমণ্ডিত ধর্মীয় উৎসব শারদীয় এই পূজার সরকারি ছুটি রয়েছে মাত্র একদিন অর্থাৎ দশমী দিনে। সেটি ভাবতেও অবাক লাগে। বিষয়টি রীতিমতো বৈষম্য ছাড়া আর কিছু নয়। তাই এই বৈষম্য নিরসনকল্পে পাঁচ দিনের শারদীয় এই দুর্গাপূজায় অষ্টমী, নবমী ও দশমী এই তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষিত হোক, যাতে সনাতনী সমাজের আবাল বৃদ্ধ বনিতা এক সাথে এই পূজায় অংশগ্রহণ করতে পারে।

আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারসহ সকল রাজনৈতিক দল সমূহকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের সকল বৈষম্যমূলক নিয়ম-কানুন বাতিল করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তথা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাও আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক ও নীতিবান বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব।

দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবি ছিল কুখ্যাত অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল করে উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের এই দেশে বসবাসরত উত্তরাধিকারীরা বিনা প্রতিবন্ধকতায় তাদের পূর্ব পুরুষদের হৃত সম্পত্তি ফেরৎ পাওয়ার। দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের ফলে এবং জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছার ফলে দেশে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইন চালু হয়। কিন্তু এই আইন চালু হওয়ার পর ট্রাইবুন্যালে মামলা দায়ের করে আদালতের রায় বাদীর পক্ষে আসার পরও ভূমি সংক্রান্ত সরকারী দপ্তরসমূহ রায় কার্যকর করায় কোন সহযোগিতা না করে বাদীকে অহেতুক কষ্ট দিচ্ছে।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন চালুর পর এদেশের সাধারণ সনাতনী সমাজ অনেক আশা নিয়ে বুক বেঁধে ছিল এই ভেবে যে, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের হৃত সম্পত্তি সহজেই ফেরত পাবো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে উঠছে না। আমরা এই ঘটনা সমূহকে বৈষম্যমূলক বলে মনে করি। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন ট্রাইবুন্যাল থেকে প্রাপ্ত রায়ের আলোকে ভূমির নামজারীসহ সকল কার্যক্রম সহজ ও সাবলিল ভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি দেশে বিরাজমান সকল বৈষম্যমূলক কালা-কানুন বাতিল করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ইদানিং কালে দেখা যাচ্ছে, সনাতন সম্প্রদায়ের কোনো কোনো ব্যক্তির ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক করে ধর্ম অবমাননাকারী পোষ্ট দিয়ে তাদেরকে ভিকটিম বানিয়ে তাদের বাড়িঘরে, মন্দিরে হামলা, ভাংচুর করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে রামু, নাছিরনগর, শাল্লা, ভোলা সদরসহ দেশের অনেক স্থানেই এই ঘটনা ঘটছে। এই সমস্ত কর্মকান্ডের যথাযথ তদন্তসহ দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি না হওয়ায় ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতিকারীরা উৎসাহিত হচ্ছে বলে মনে করি। এই ঘটনা সমূহের যথাযথ তদন্ত ও দায়ী-দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণ আইনে মামলা হওয়ার কারণে তারা গ্রেপ্তার হলেও আইনের মারপ্যাঁচে মুুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। এই সমস্ত সাম্প্রদায়িক হামলার প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত দ্রুত বিচার আইনে মামলা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত শাখা সমূহের আরো জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি।

রামু, নাছিরনগর, শাল্লা এবং ভোলা সদরে যাদের নামে ধর্মীয় অবমাননার কথা বলা হয় তারা তথ্য প্রমাণে দোষী প্রমাণিত হয় না। কিন্তু এই ভিকটিমদের দীর্ঘদিন যাবত কারাগারে থাকতে হয়।

সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনায় হিন্দু বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা ও ভাংচুরকারীরা দ্রুত জামিনে মুক্তি পেয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে নিরিহ ভিকটিম ঝুমন দাস বা গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে’রা সহজে মুক্তি পায় না। আমি ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বর্ষীয়ান নেতা গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে’র মুক্তি দাবি করি।

ভোলার ঘটনায় জানা যায় যে, গৌরাঙ্গ বাবুর ফেইসবুক হ্যাক হওয়ার পর উনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি থানায় জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার ব্যবহৃত ফেসবুক থেকে ধর্ম অবমাননামূলক পোষ্ট দেওয়া হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে গৌরাঙ্গ বাবুর বাড়ি ও গাড়িতে হামলাসহ তাকে কারান্তরীন রাখা হয়েছে।

আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ দেশে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ সংখ্যালঘু কমিশন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় করার দাবি জানিয়ে আসছি। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই দাবিগুলোর প্রতি একাত্বতা প্রকাশ করেছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় অদ্যাবধি আমাদের এই দাবিগুলো বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ দেখি না।  তাই প্রতিশ্রুত এই দাবিসমূহ অবিলম্বে কার্যকর করার জোরদার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজায় তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি।

আমি মনে করি অসাম্প্রদায়িক ও মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো সমাধান করবেন।

মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা: আইনজীবী, পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top

প্রধান সম্পাদক: নজরুল ইসলাম শিপার
সম্পাদক:কামরুল হাসান জুলহাস

বক্স ম্যানশন, ৩য় তলা, বন্দর বাজার, সিলেট-৩১০০।
০১৭২০-৪৪৫৯০৮
news.talashbarta@gmail.com